অচেনা নম্বর থেকে ফোন, লটারি জেতার লোভ, কম সুদে ঋণের প্রস্তাব কিংবা ব্যাংকের কর্মকর্তা পরিচয়ে প্রতারণার চেষ্টা—এসব ঘটনা এখন প্রায় নিত্যদিনের বাস্তবতা। অনেকেই বিস্মিত হয়ে ভাবেন, যে নম্বরটি শুধুমাত্র পরিবার বা ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের কাছেই ছিল, সেটি প্রতারকদের হাতে গেল কীভাবে?
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর এই যুগে মানুষের অজান্তেই তৈরি হচ্ছে বিশাল ডিজিটাল ডেটাবেজ। বিভিন্ন অ্যাপ, ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন সেবার মাধ্যমে ব্যক্তিগত ফোন নম্বর খুব সহজেই পৌঁছে যাচ্ছে প্রতারক চক্রের হাতে। পরে সেই তথ্য ব্যবহার করেই চালানো হচ্ছে টার্গেটেড প্রতারণা।
বর্তমানে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীরা প্রতিদিন নানা ধরনের অ্যাপ ব্যবহার করেন। গেম, ফটো এডিটর, ভিডিও অ্যাপ কিংবা সাধারণ ফ্ল্যাশলাইট অ্যাপ ইনস্টল করার সময় অনেকেই না পড়েই দ্রুত ‘অ্যালাউ’ বাটনে চাপ দেন। এর ফলে অনেক অ্যাপ ব্যবহারকারীর কন্টাক্ট লিস্ট, মেসেজ ও কল হিস্টরির অনুমতি পেয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু ক্ষতিকর অ্যাপ এই সুযোগে ফোনে থাকা সব নম্বর নিজেদের সার্ভারে আপলোড করে। ফলে আপনি নিজে সতর্ক থাকলেও, আপনার নম্বর যদি অন্য কারও ফোনে সেভ করা থাকে এবং তিনি ঝুঁকিপূর্ণ অ্যাপ ব্যবহার করেন, তাহলেও আপনার নম্বর ফাঁস হয়ে যেতে পারে।
অচেনা নম্বর শনাক্ত করতে অনেকে বিভিন্ন কলার আইডি অ্যাপ ব্যবহার করেন। এসব অ্যাপের একটি বড় অংশ ব্যবহারকারীদের কন্টাক্ট লিস্ট সংগ্রহ করে বিশাল পাবলিক ডেটাবেজ তৈরি করে। পরে সেই তথ্য বিভিন্ন তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি করা হয় অথবা সেখান থেকেই স্ক্যামাররা সচল নম্বর সংগ্রহ করে।
সাইবার বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো অ্যাপ ব্যবহারের আগে তার প্রাইভেসি পলিসি ও পারমিশন ভালোভাবে যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।
এছাড়া বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সময় ই-কমার্স সাইট, ব্যাংক, টেলিকম কোম্পানি ও রাইড শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মের ডেটাবেজ হ্যাক হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। এসব ঘটনায় ব্যবহারকারীদের নাম, ফোন নম্বর, ইমেইলসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত তথ্য চুরি হয়ে যায়। পরে হ্যাকাররা সেই তথ্য ‘ডার্ক ওয়েব’-এ বিক্রি করে দেয়। খুব অল্প দামে লাখ লাখ সচল নম্বর কিনে নেয় স্ক্যামার চক্র, যা ব্যবহার করা হয় ফিশিং কল, ভুয়া অফার ও আর্থিক প্রতারণার কাজে।
শপিং মল, সুপারশপ বা বিভিন্ন ব্র্যান্ডের প্রচারণায়ও প্রায়ই গ্রাহকদের নাম ও ফোন নম্বর সংগ্রহ করা হয়। ডিসকাউন্ট, লটারির কুপন কিংবা বিশেষ অফারের আশায় অনেকেই সহজে ব্যক্তিগত তথ্য দিয়ে দেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু প্রতিষ্ঠান এসব তথ্য মার্কেটিং কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দেয়, যা পরে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রতারকদের হাতেও পৌঁছে যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নিরাপদ নয় ব্যক্তিগত নম্বর। অনেক ব্যবহারকারী ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে নিজের নম্বর ‘পাবলিক’ করে রাখেন। স্ক্যামাররা স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার বা ‘বট’ ব্যবহার করে এসব তথ্য সংগ্রহ করে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘ডেটা স্ক্র্যাপিং’।
বিশেষজ্ঞরা ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন—
- কোনো অ্যাপ ইনস্টল করার আগে সেটি কী ধরনের পারমিশন চাইছে তা যাচাই করুন
- অপ্রয়োজনীয় কন্টাক্ট ও মেসেজ অ্যাক্সেস বন্ধ রাখুন
- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফোন নম্বর ‘অনলি মি’ করে রাখুন
- সন্দেহজনক ওয়েবসাইট বা ফর্মে ব্যক্তিগত নম্বর ব্যবহার এড়িয়ে চলুন
- গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টে টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন চালু রাখুন
- অচেনা নম্বর থেকে আসা সন্দেহজনক কল, মেসেজ ও লিংক সম্পর্কে সতর্ক থাকুন
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান ডিজিটাল যুগে শতভাগ গোপন থাকা কঠিন হলেও সামান্য সচেতনতা মানুষকে বড় ধরনের আর্থিক ও মানসিক ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে পারে।
Iqbal Hossain